Part 3 | Page 270
খন্ডঃ 3 | পৃষ্ঠাঃ 270
"আল-আম্বিয়া" গ্রন্থে তাঁর বক্তব্য নিম্নরূপ: "আল্লাহ আমার রুহ ফিরিয়ে দিয়েছেন" বাক্যটি একটি 'হালিয়া' (অবস্থাজ্ঞাপক) বাক্য। আরবি ব্যাকরণের নিয়ম হলো, 'জুমলা-ই-হালিয়া' (অবস্থাজ্ঞাপক বাক্য) যদি অতীতকালীন ক্রিয়া দ্বারা শুরু হয়, তবে সেখানে 'কাদ' (قد) উহ্য থাকে। যেমন মহান আল্লাহর বাণী: "অথবা তারা তোমাদের কাছে এমন অবস্থায় এল যে, তাদের অন্তর সংকুচিত হয়ে গেছে" [৪: ৯০]। এখানে 'হাসিরাত' (সংকুচিত হওয়া) এর অর্থ হলো 'কাদ হাসিরাত' (সংকুচিত হয়ে গেছে)। তদ্রূপ এখানেও 'কাদ' উহ্য ধরা হবে এবং বাক্যটি অতীতকালীন অর্থ প্রকাশ করবে, যা প্রত্যেকের সালাম প্রদানের পূর্বেই সম্পন্ন হয়েছে। এখানে 'হাত্তা' অব্যয়টি কারণ দর্শানোর জন্য নয়, বরং কেবল সংযোগকারী হিসেবে 'এবং' অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে।
সুতরাং হাদিসটির নিহিতার্থ দাঁড়ায়: "এমন কেউ নেই যে আমাকে সালাম দেয়, অথচ তার পূর্বেই আল্লাহ আমার রুহ আমার নিকট ফিরিয়ে দিয়েছেন এবং আমি তার সালামের জবাব দেই।" মূলত বিভ্রান্তিটি তৈরি হয়েছে এই ধারণা থেকে যে, "আল্লাহ আমার রুহ ফিরিয়ে দিয়েছেন" বাক্যটি বর্তমান বা ভবিষ্যৎকাল নির্দেশক এবং 'হাত্তা' অব্যয়টি কারণ দর্শানোর জন্য—যা সঠিক নয়। আমরা যেভাবে ব্যাখ্যা করেছি, তাতে মূল সংশয়টি নিরসন হয়। অর্থের দিক থেকেও এটি সমর্থিত হয়; কারণ 'রুহ ফিরিয়ে দেওয়া' যদি বর্তমান বা ভবিষ্যৎকালীন অর্থ নেওয়া হয়, তবে প্রত্যেক সালামকারীর সালামের সময় এর পুনরাবৃত্তি আবশ্যক হয়ে পড়ে। আর রুহ ফেরার পুনরাবৃত্তি মানে হলো রুহ বিচ্ছেদেরও পুনরাবৃত্তি।
আর রুহ পৃথক হওয়ার পুনরাবৃত্তি থেকে অনেক আপত্তিকর বিষয় দেখা দেয়। এর মধ্যে একটি হলো: বারবার রুহ নির্গমন ও প্রত্যাবর্তনের ফলে পবিত্র শরীরের কষ্ট হওয়া, অথবা কষ্ট না হলেও এটি এক ধরনের অস্বাভাবিকতা। দ্বিতীয়ত: এটি অন্যান্য নবী ও শহীদদের অবস্থার পরিপন্থী, কারণ বরজখী জীবনে কারোর ক্ষেত্রেই বারবার রুহ পৃথক হওয়া ও ফিরে আসার বিষয়টি প্রমাণিত নয়। অথচ রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) জীবনের নিরবচ্ছিন্নতার ক্ষেত্রে অধিকতর হাকদার, যা উচ্চতর মর্যদাপূর্ণ। তৃতীয়ত: এটি কুরআনের পরিপন্থী, কারণ কুরআন অনুযায়ী মাত্র দুবার মৃত্যু ও দুবার জীবন রয়েছে। বারবার রুহ ফেরার অর্থ হলো বহুবার মৃত্যু হওয়া, যা অগ্রহণযোগ্য। চতুর্থত: এটি আম্বিয়ায়ে কেরামের জীবন সম্পর্কিত মুতাওয়াতির হাদিসসমূহের বিরোধী। যা কিছু কুরআন ও সুন্নাহ-ই মুতাওয়াতিরের বিরোধী হবে, তার ব্যাখ্যা (তাবীল) করা আবশ্যক—সমাপ্ত।
ইমাম সুয়ূতী (রহ.)-এর নিকট এটিই সর্বোত্তম ও শক্তিশালী উত্তর, যা তিনি তাঁর রিসালায় স্পষ্ট করেছেন। তিনি ইমাম বায়হাকী (রহ.) থেকে এই উত্তরটি গ্রহণ করেছেন এবং এর বিস্তারিত আলোচনা সামনে আসবে। দ্বিতীয় উত্তর: তিনি (রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) ঊর্ধ্বজগতের কার্যাবলীতে নিমগ্ন থাকেন; যখন কেউ তাঁকে সালাম দেয়, তখন তাঁর মনোযোগ ফিরে আসে যাতে তিনি সালামের উত্তর দিতে পারেন। সুয়ূতী বলেন: 'রুহ ফিরে আসা' শব্দটি দিয়ে বিচ্ছেদ বোঝানো জরুরি নয়, বরং এটি অবস্থার রূপান্তর বোঝাতে রূপক হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। এখানে 'সালামের উত্তর প্রদান'-এর সাথে ভাষাগত সামঞ্জস্য বজায় রাখার জন্য 'রুহ ফিরে আসা' শব্দটি হাদিসের শুরুতে আনা হয়েছে।
এখানে রুহ ফিরে আসার অর্থ দেহ থেকে পৃথক হওয়ার পর পুনরায় ফিরে আসা নয়; বরং নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বরজখী জীবনে আধ্যাত্মিক জগতে নিমগ্ন থাকেন এবং মহান আল্লাহর দর্শনে মগ্ন থাকেন, যেমনটি দুনিয়াতে ওহী নাজিলের সময় হতো। সেই অবস্থা থেকে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসাকেই 'রুহ ফিরে আসা' দ্বারা ব্যক্ত করা হয়েছে। ইমাম বায়হাকী বলেন: সম্ভাবনা রয়েছে যে এটি একটি অর্থগত বা রূপকভাবে ফিরে আসা। অর্থাৎ তাঁর পবিত্র রুহ এই নশ্বর জগতের পরিবর্তে মহান আল্লাহর দরবারে এবং ঊর্ধ্বজগতে নিমগ্ন থাকে। যখন কেউ তাঁকে সালাম দেয়, তখন তাঁর পবিত্র রুহ এই জগতের দিকে মনোনিবেশ করে যাতে সালামকারীর সালাম উপলব্ধি করতে পারেন এবং উত্তর দিতে পারেন—সমাপ্ত।
হাফেজ আবু আবদুল্লাহ মুহাম্মদ বিন আহমদ বিন আব্দুল হাদী আল-মাকদিসী তাঁর 'আস-সারিমুল মুনকী' গ্রন্থে (পৃষ্ঠা ১৭৯, ২০৩) এই দুটি উত্তরের পর্যালোচনা করে বলেন: উভয় উত্তরের ক্ষেত্রেই আপত্তি রয়েছে। প্রথমটির সারমর্ম হলো রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর মৃত্যুর পর তাঁর রুহ দেহে ফিরে আসা এবং সালাম প্রদানের পূর্বেই তা নিরবচ্ছিন্নভাবে বিদ্যমান থাকা। এই অর্থটি হাদিসে স্পষ্টভাবে উল্লেখ নেই এবং এটি হাদিসের বাহ্যিক অর্থের অনুকূলও নয়। বরং এটি বাহ্যিক অর্থের বিরোধী; কেননা "এমন কেউ নেই যে আমাকে সালাম দেয়" এর পর "আল্লাহ আমার নিকট রুহ ফিরিয়ে দেন" অংশটি সালামের পরেই রুহ ফিরিয়ে দেওয়ার দাবি রাখে, দেহে রুহ নিরবচ্ছিন্ন থাকার দাবি রাখে না। জেনে রাখা প্রয়োজন যে, সালামের পর দেহে রুহ ফিরিয়ে দেওয়া এবং মৃত্যুর পর দেহে রুহ ফিরে আসার অর্থ এই নয় যে সেটি কিয়ামতের পূর্বে দুনিয়াবী জীবনের মতো নিরবচ্ছিন্নভাবে বজায় থাকবে। বরং বরজখী জীবনে দেহে রুহ ফিরিয়ে দেওয়া একটি বরজখী বিষয়, যা মৃত ব্যক্তি থেকে 'মৃত' পরিচয়টিকে ঘুচিয়ে দেয় না, যেমনটি বারা বিন আযেব-এর হাদিসে প্রমাণিত হয়েছে।